Legends of Magura District
মাগুরা জেলার কিংবদন্তী
The Legends of Magura district


কিংবদন্তীকে ইংরেজি ভাষায় লিজেন্ড, লোকাল ট্রাডিশন, পপুলার এন্টিকুইটস, মেমোবাট বলা হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ডিকশনারি অব ফোকলোর মাইথোলাজি এ্যান্ড লিজেন্ডস (নিউইয়র্ক-১৯৫০) গ্রন্থে লিজেন্ড সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

“পূর্বকালে বিশেষ কোন ভোজ উৎসবে যখন কোন সন্নাসী বা ধর্মগুরুর জীবন বৃত্তান্ত কথিত বা গীত হয় তাকেই বলা হত লিজেন্ড।” ডরসন বলেছেন,“ লিজেন্ড এক প্রকার লোক কাহিনী যা যুগ যুগান্তর, কালান্তর ধরে সান্ধ্য আকাশের তারকার মত লোক চিত্তে ফুটতে থাকে। লোক কাহিনী বা রূপ কথাকে লোকমানস গল্প হিসেবে গ্রহণ করে কিন্তু লিজেন্ড বা কিংবদন্তীকে তারা বিশ্বাস করে।” কিংবদন্তীর বহু মাত্রিক আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই মটিফটির যুগ, কাল, সময় সামাজিক অবস্থা ও ধর্ম বিশ্বাস ইত্যাদি। কিংবদন্তীকে সাধারণতঃ ১২ টি ভাগে ভাগ করা যায। ভাগগুলো হলো (১) ইতিহাস ভিত্তিক (২) অর্ধ ইতিহাস ভিত্তিক (৩) পুথি ভিত্তিক (৪) সন্ন্যাসী দরবেশ (৫) প্রেম বিরহ (৬) পরী (৭) ভূতপ্রেত (৮) স্থানীয় কাহিনী (৯) লোকপুরান (১০) রূপ কাহিনী (১১) সর্বাত্নকবাদমূলক (১২) সাম্প্রতিক ঘটনা ভিত্তিক। জেলা মাগুরার বিভিন্ন স্থানে এমনি ধরণের অনেক কিংবদন্তী শোনা যায়। মাগুরা জেলার ১১ টি কিংবদন্তী এখানে তুলে ধরা হলোঃ


নদের চাঁদ ঘাটঃ
কুমীর জলের ভয়ঙ্কর জন্তু। কিন্তু মানুষের নামের আগে কুমীর থাকলে বিস্ময় বলে মনে হয়। অনেকে হয়তো প্রশ্ন করবে। কুমীরের নাম নদের চাঁদ কি করে হলো। আসলে নদের চাঁদ মানুষ ছিল। পরে সে কুমীর হয়ে মধুমতি নদীতে বসত করতো।

অনেকদিন আগের কথা জেলের ছেলের নাম নদের চাঁদ। ভরা নদীর উতাল পাতাল ঢেউ দেখে তার মন নেচে উঠে। নদের চাঁদ ব্যাকুল হয়ে পড়ে হঠাৎ ব্যাকুলতা ভঙ্গ করে আবার সে গুণগুণ করে গান গেয়ে উঠে। গান শুনে তার প্রাণ মন ব্যাকুল হয়। মায়ের একমাত্র সন্তান নদের চাঁদ। তাকে কিছুতেই পাঠাতে চায়না মাছ ধরতে নদীর বুকে। তার ভয় হয়। নদের চাঁদ যদি তার বাবার মত আর ফিরে না আসে। ব্যথায় কেঁপে উঠে নদের চাঁদের মা। চোখের পাতায় ভরে উঠে নোনা জল। উদাস হয়ে অনেক সময় তাকিয়ে থাকে মধুমতির জলের দিকে। নদের চাঁদের তখন জন্ম হয়নি। নদের চাঁদ তার মাতৃগর্ভে অবস্থান করছে। আষাঢ় মাস কেবল শুরু হয়েছে। নদের বাবা গদাধর জানতে পারলো পদ্মায় প্রচুর মাঝ ধরা পড়ছে। জাল নৌকা নিয়ে তৈরি হয়ে গেলো গদাধর। স্ত্রী তাবে কয়েকদিন পরে যাবার জন্য অনুরোধ করলো। আর বললো, কয়দিন পরেই তো তোমার ঘরে ছাওয়াল আসতেছে এই সময় তুমি বাড়ি থাকবা না। তালি আমি কিঅরব? গদাধর কোন বাঁধা নিষেধ শুনেনি। হেসে হেসে শুধু বলে- ছাওয়াল আসতেছে বলেই তো তড়িঘড়ি যাচ্ছি মাছ ধরতে। টাহা পয়সার দরকার অবেনে।”

গদাধর চলে গেলো। যতদূর পর্যন্ত তার লাল পালের নৌকা দেখা গেলো নদের মা ঘাটে দাঁড়িয়ে তা দেখলো। এক সময় তার চোখের কোন দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। কয়েকদিন পরে নদের চাঁদের জন্ম হলে মা আনন্দে বুকের সাথে মৃদুভাবে চেপে ধরলো নদের চাঁদকে। দিন গুণতে থাকলো গদাধর কবে ফিরে আসবে। মাস পরে গদাধরের সঙ্গীরা ফিরে এলো ঘাটে। তারা খবর দিলো গদাধর আর ফিরে আসবে না। নৌকাডুবিত গদাধর পদ্মার গভীর জলে হারিয়ে গেছে। নদের চাঁদের মায়ের কান্নায় জেলে পাড়ায় শোকের ছায়া নেমে এলো।

নিয়তি বড়ই নিষ্ঠুর। নিয়তির কাছে হার মানা ছাড়া কারো উপায় নেই। স্বামীর মৃত্যুকে নদের মা প্রথমে ভেঙ্গে পড়লেও পরে ছেলের মুখের পানে চেয়ে সান্তনা খুঁজে পেলো ও ভাবলো, এখন শক্ত না হলে সেওতো হারিয়ে যাবে। অনেক দুঃখ কষ্টের ঝড়কে পেরিয়ে নদের চাঁদ যৌবনে পদার্পন করলো। সেও মাছ ধরতে যেতে চায় পদ্মার বুকে। অবুঝ মায়ের মন ছেলেকে কোন রূপেই মাছ ধরতে সে পাঠাবে না। তবে মা চায় নদের চাঁদ ক্ষেত খামারে কাজ করুক। তাই নদের চাঁদকে ঘরে ধরে রাখার জন্য তার মা তাকে বিয়ে দেবার মন স্থির করলো। একদিন নদের চাঁদকে বিয়ের কথা বলেও ফেললো তার মা। একথা শুনে নদের চাঁদ উদাস হয়ে পড়লো। রাঙা বউয়ের কথা শুনে তার মনে কোন সাড়া জাগলো না। তার মন ঘরে থাকতে চায় না। সে মনে মনে পথ আবিস্কার করে ফেললো। মাকে না বলে পালিয়ে যেতে হবে।

রাত গভীর। মা গভীর তন্দ্রার ক্রোড়ে পড়ে আছে। চারিদিকে কোন সাড়া শব্দ নেই। নদের চাঁদ বেরিয়ে পড়লো অজানার পথে। মায়ের আশা আকাঙ্খার স্বপ্ন মারিচিকার মত মনে হলো।

দশ বছর পার হয়ে গেলো। নদের মা চোখের জল ফেলতে ফেলতে দৃষ্টি শক্তি হারাতে বসলো একদিন গভীর রাতে আবার নদের চাঁদ ফিরে এলো। মাকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইল। মা আবার চোখ তুলে তাকালো। আঁধার ঘরে আবার আলোর শিখায় আলোকময় হলো। মা মনে মনে ভাবলো আর দেরি করা ঠিক হবে না। এবার নদেকে বিয়ে দিতে হবে। নদের চাঁদ ও মানা করলো না।

নদের চাঁদ সরলাকে ছোটকাল থেকেই চেনে। জেলে পাড়ায়ই সরলার বাবার বাড়ি। সরলার ছিল সুন্দরি নাদুস নুদুস গোলগাল চেহারা। নদের চাঁদের সাথে সরলার বিয়ে হয়ে গেলো। রাঙা বউ পেয়ে নদের চাঁদ আনন্দে নেচে উঠলো। বউয়ের ভালবাসার বাঁধন কেটে নদের চাঁদ আর পদ্মার বুকে মাছ ধরতে যেতে পারলো না।

একদিন রাতের বেলা নদের চাঁদ আর সরলা বিছানায় শুয়ে আছে। হঠাৎ নদের চাঁদ বলে “আমার কপাল খুব ভাল, তাই না সরলা।” সরলাকে জড়িয়ে ধরে নদের চাঁদ। “কিসির জন্যি।” হেসে প্রশ্ন করে সরলা।

এত তাড়াতাড়ি অরে তোর মত মাইয়ে যে আমার বউ হয়ে আসবি তা কোন দিনিই ভাবতি পারিনি। “তুই সত্যিই সোনাবউ।”  সোনা মানে। তোরে কি আমি ভুল কতিছি। তাই কি কতি চাচ্ছিস’। ভুল না তয় কি? মুখি মুখি শুধু তুমি আমায় ভালবাস।’ “তার মানে? তার মানে বুঝতেছো না। আমারে তুমি ভালবাস না। কেডা কলো তরে ভালবাসিনে। কবে আর কেডা। আমিই তো বুঝতে পারতেছি তুমি আমারে ভালবাস না। ভালবাসলি কি আর ফাহি দিতে।’ তুই কি কতেছিস আমি কিছুই বুঝতেছিনে। কিসির ফাহি দিলাম তা কবি তো সরলা।’  ফাহি নাতো কি? বিয়ের আগে কহানে ছিলে? কথা কওনা কিসির জন্য’। কথাটা শুনে নদের চাঁদ বলে বড় ব্যথা দিলি সরলা। যে কথা কতি চাইনে সেই কতাই তুই শুনবি। মাইয়ে মানুষির মন বুঝনো যায় না। তাই তুই ও কথা শুনতি চাসনে। ও কথা গোপন অরে রাখ। এমন কি কথা যে গোপন অরে রাকতি হবে। বুঝতি পারছি, আর এটা বউ ছিল তোমার তাই না। আর বউ ছিল না। কতাডা তুই গোপন অরে রাখ। এক কানে গেলি দশ কানে যাবেনে।”

তালি তুমি কবা না।” অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেয় সরলা। নদের চাঁদ ও কোন কথা বলে না। তারপর কানের কাছে মুখ দিয়ে নদের চাঁদ ফিস ফিস করে বলে- কারোরি তো কবি নে কোনদিন। কোনদিনই কারোরি কবো না। তুমি কও দেহি শুনি।

তালি শোন দশ বছর কামরুখ ছিলাম। ওখানকার নি সাইয়েগার কাছ থেকে যাদু শিহিছিলাম। এ যাদুর বলে আমি সাপ, বিচ্ছু, হাতী, ঘোড়া, বাঘ, ভল্লুক ও কুমীর হতি পারি।”

সত্যিই তুমি এতসব কিছু হতি পার।”
পারি বলেই তো কলাম। কারোরি কবিনে সরলা।
ওস্তাদের মানা আছে।

“ওস্তাদের যদি মানা থাকলো তালি এসব শিয়ে তোমার লাভডা কি“ আবার অভিমান করে সরলা। তিন দিন চলে গেলো। সরলা নদের চাঁদের সাথে কথা বলে না। সরলার প্রতি তার ভীষণ রাগ হয়। সরলাকে একদিন দুপুর বেলা ঘরের মধ্যে ডেকে এনে বলে-“আমি তোর দেহাবো কারোরি কবিনে। মাও যেনো জানে না।” “কহন দেহাবা তাই কওনা।” খুশীর রেখা নামে সরলার অধরে।

নদের চাঁদের আলাদা ঘর। এক সময় রাত গভীর হলো। নদের চাঁদ একটি মাটির পেয়ালায় পানি নিয়ে বিড় বিড় করে মন্ত্র পড়ে ফুক দিলো। তারপর সরলাকে উদ্দেশ্য করে বললো-“এই পানি দিয়ে তুই আমারে মানুষ অরতি পারবি। আমি এহনই কুমীর হচ্ছি।” নীরবে দাঁড়িয়ে আছে সরলা চেয়ে আছে তার দিকে। কোন সময় কুমীর হবে। হঠাৎ কাঁথার পাশ দিয়ে বেরিয়ে পড়লো তার দেহ। নদের চাঁদ কুমীর হয়ে গেলো। ভয়ে সরলা কাঁপতে লাগলো।  সে দেখে যে একটা তাজা কুমীর। সোজা হয়ে লেজ নাড়ছে। সরলার কপাল খারাপ। সে ভুলে গেলো তার স্বামী নদের চাঁদকে। ভুলে গেলো পেয়ালায় রাখা পানি কুমীরের গায়ে ছিটিয়ে দিতে। অপর দিকে উচ্চস্বরে চিৎকার দিলো। দৌড়ে পালাতে গিয়ে পায়ের ধাক্কা লেগে পেয়ালার পানি পড়ে গেলো। সরলার উচ্চ স্বরে চিৎকারে নদের চাঁদের বাড়িতে কান্নার রোল পড়লো। নদের চাঁদ কুমীর হয়ে গড়াগড়ি দিতে লাগলো। সরলার দিকে চেয়ে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলো। তিন দিন পর নদের চাঁদ কুমীর বেশে মধুমতি নদীর পানিতে নেমে পড়লো।

এক মাস পনেরো দিন পর কামরূপ থেকে নদের চাঁদের মহিলা উস্তাদকে খবর দিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু সে যখন মধুমতি নদীর পাড়ে এসে নদের চাঁদ বলে ডাক দিলো তখন কুমীর নদের চাঁদ মুখে ইলিশ মাছ নিয়ে ভেসে উঠলো। তখন তার মহিলা উস্তাদ জানালো নদের চাঁদকে আর মানুষ করা যাবে না। সে মাছ ভক্ষণ করে ফেলেছে। নদের চাঁদের মাকে অনেক সাস্তানা দিয়ে মহিলা উস্তাদ নৌকা যোগে কামরূপ ফিরে গেলো।

সরলা সারাদিন নদীর পারে বসে থাকতো। স্বামী শোকে সে পাগলী হয়ে গেলো। পরে সে নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করে। কুমীর নদের চাঁদ তার লাশ নদীর পানির মধ্যে থেকে তুলে এনে পানির উপর ভেসে উঠলো। নদের চাঁদের মা খবর পেয়ে নদী তীরে এসে দাঁড়ালো। এক সময় পানির কিনারে এসে নদের চাঁদের মা নদে নদে বলে ডাকতে লাগলো। নদের চাঁদ সরলার লাশ মুখে করে মাঝ নদী থেকে ছুটে এলো তার মায়ের কাছে। তারপর মায়ের পায়ের কাছে সরলার লাশটি রেখে নদীতে ডুবে গেলো। তারপর আর কুমীর নদের চাঁদ ভসে উঠেনি। লোকে বলে সরলার আত্মহত্যার বেদনা কুমীর নদের চাঁদ সহ্য করতে না পেরে সেও আত্মহত্যা করেছিল।

মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার মানুষের মুখে মুখে এ কিংবদন্তী আজও শোনা যায়। মহম্মদপুর উপজেলা সদর থেকে সামান্য দূরে পূর্ব দিকে মধুমতীর তীরে ‘নদের চাঁদ ঘাট’ আছে। এককালে এঘাটে স্টিমার ভিড়তো। ইতিহাস প্রমাণ করে, গুপ্ত যুগে নদের চাঁদ ঘাট এলাকায় মাটি খনন কালে স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল। এ মুদ্রা বর্তমানে কলকাতার মিত্র শাখায় সংরক্ষিত আছে। নদের চাঁদ যে গ্রামে বাস করতো তার নাম ছিল পাঁচুড়িয়া। এ ঘাটের পাশেই একটু দূরে আজও পাঁচুড়িয়া নামে একটি গ্রাম আছে। কুমীর নদের চাঁদকে নিয়ে গ্রাম্য কবি গান রচনা করেছেন। একজন কবির ধূয়া গানে আছে- “শুনবে পাঁচুড়িয়া গার এক খবর নদের চাঁদ হইছে কুমীর ও তার মায় হইছে পাগল কামরূপ যাইয়ে নদের চান মন্ত্রর শিক্ষা নেয় ও তার মায়ের কাছে নাহি কয়, সরলা বলছি বলছি পতি ধরি তোমার পায়

তুমি যদি হও কুমীর আমি নয়নে দেখতাম তাই, আমার মাথার কিরা লাগে যদি তোমায় ছেড়ে যাই। নদের চান জল পড়ে কুমীর হইলো সরলা দেখে অমনি দৌড় দিলো, দৌড়ে যেতে কালে জল ঢেলে পাইলো, নদের চাঁদ মাথায় হাত দিয়ে কানতে লাগলো বিধি বুঝি এবার বাম হইলো। এমন সময় মা জননী কোন খানে রইলো। শুনবে বেয়াকুব নদে কেন শুনলি কথা তোর মা যানে কোটে মাথা নদের চান বাবা গেলি কোথা অধম হাকিম চান কয়, নদের চাঁদের কপালে এই ছিল, এমন কুমীর তোরে কিবা শিখা।

এ কিংবদন্দীর ওপর ভিত্তি করে আমার (গোলাম মোস্তফা সিন্দাইনী) লেখা নাটক নদের চাঁদ ঘাট। নাটক বাংলাদেশ বেতার খুলনা কেন্দ্র থেকে ১৯৯৮ সালের ৪ মে প্রচার হয়। ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে নাটকটি পুনঃপ্রচার হয় ২০০২ সালের ২ অক্টোবর।


পরীর দালানঃ
বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের সূক্ষ্ণ যে মিলনভূমি বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না। তেমন ধরণের কিংবদন্তী এটি। সংজ্ঞা অনুসারে ঠিক আছে। কিংবদন্তীর একটি বিশেষ মটিভ হলো পরীদের গল্প। কুলু কুলু রবে বয়ে চলেছে মধুমতি। মাগুরা জেলার পূর্ব পাশ দিয়ে এটি প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। মুহম্মদপুর উপজেলার একটি গ্রামের নাম পাল্লা। পাল্লাতে একটি হাইস্কুল আছে। এটি মধুমতি নদীর পাড়ে অবস্থিত। পাল্লাস্কুল যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে সোজা পূর্ব দিকের নদীর বিশালতা অনেক বেশি। আর এককালে পানির গভীরতাও ছিল অনেক। বর্তমানেও সেখানে পানির গভীরতা অনেক বলে জানা যায়। অনেক দিন আগের কথা মধুমতির এ গভীর পানিতে নাকি পরীর দালান ছিল। এ দালানটি নাকি একবার নদীর পানি কমে গেলে কিছু অংশ ভেসে উঠেছিল। এ দালানের মধ্যে পরীরা বাস করত বলে শুনা যায়। মধুমতির পূর্ব পাড়ের নাম কালীতলা। সেখানে এককালে অনেক হিন্দু ধনী লোকের বসবাস ছিল। তাদের ছিল অনেক দালান কোটা। কয়েকদিনের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। তবে একটি দালান অক্ষত অবস্থায় নদী ভাঙ্গনের কারণে পুতে যায়। নদীর স্রোতের দালানের আশে পাশের মাটি সরিয়ে নিয়ে যায়। আর নদীর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে অক্ষত দালানটি। পরীরা সব জায়গায় বিচরণ করতে পারে। তাই এ দালানে পরীরা এসে আস্তানা করে। একবার নদীতে ভীষণ তুফান হচ্ছিল। হঠাৎ একটি জেলে নৌকা কালীতলার গভীর জলে ডুবে যায়। নৌকার সাথে জেলেও ডুবে যায়। এক সময় পানির নীচে ইটের মত শক্ত কিছু  তার হাতে পড়ায় তা ধরার জন্য চেষ্টা করে। অনেক চেষ্টা করে সে জালনার একটি সিক ধরে ফেলে। সিকে হাত পড়ায় সে বুঝতে পারে যে এটি দালান। জেলে আবার একজন ভাল ডুবুরিও ছিল। দীর্ঘ সময় পানির নিচে ডুবে থাকার মন্ত্র নাকি সে জানতো। জেলে দালানের দরজা খোঁজার জন্য মন্ত্র পড়ে আস্তে আ হাত দিয়ে দালানের গা ধরে এগিয়ে চললো। এক সময় একটি দরজাও পেয়ে গেল। জেলে দরজা খোলার জন্য চেষ্টা করলো। অনেক চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হল। সে দাঁড়িয়ে ভাবছিল কি করবো? হঠাৎ দরজা খুলে গেলো। দরজা খোলার পর সে দালানের মধ্যে প্রবেশ করলো। আর অমনি দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। জেলে এগিয়ে চললো। সে দেখতে পেলো দালানের মধ্যে কোন পানি নেই। দালানের কামরা গুলোতে দিনের মত আলোকময় বলে মনে  হলো। দালানের মধ্যে পানি প্রবেশ করতে পারছে না।

জেলে দালানের কয়েকটি কামরা ঘোরা ঘুরি করে কিছুই দেখতে পেলো না। কামরাগুলোতে কিছুই নেই। এক সময় জেলে ঘুরতে ঘুরতে অপর একটির কামরার দরজার কাছে এসে দাঁড়াতে একটা বিকট শব্দ হয়ে দরজা খুলে গেলো আর তার সামনে এসে দাড়ালো এক অপূর্ব সুন্দরী কন্যা। সেই কন্যা জেলেকে ডেকে নিয়ে গেলো তার কক্ষের মধ্যে।

তার পর জিজ্ঞেস করলো “কি জন্য এখানে এসেছিস। তোকে আর ফিরে যেতে দেবো না। এখানে তোর চিরকাল থাকতে হবে। ” একথা বলে সে দরজা বন্ধ করে দিলো।

অনেক সময় পার হয়ে গেলো। জেলে বসে কান্না শুরু করলো। এমন সময় আবার সেই অপূর্ব কন্যা জেলের কাছে এসে দাঁড়ালো। তার পরিচয় দিলো। সে একজন পরী। জেলে ফিরে আসার জন্য তার পা জড়িয়ে ধরতে গেলে হঠাৎ সে উধাও হয়ে গেলো। জেলে মহা চিন্তায় পড়লো। আবার সে কান্না শুরু করলো।

আবার এসে পরী দাঁড়ালো তার সমনে। আর বলতে লাগলো- “তোর  ঘরে স্ত্রী আছে আর আছে ছোট ছেলে মেয়ে তাই তোকে ছেড়ে দিলাম। তবে তোর আর সারা দিন পরিশ্রম করে মাছ ধরতে হবে না। প্রতিদিন সূর্য উঠার আগে এখানে এসে জাল ফেললে এক সাথে  অনেক মাছ পাবি। তবে এ কথা কাউকে বললে তোর বিপদ হবে।

জেলে তার শর্ত মেনে নিয়ে নৌকাসহ পানির উপরে ভেসে উঠলো। পরীর কথা মত প্রতিদিন সেখানে জাল ফেলে সে প্রচুর মাছ ধরতে লাগলো। কিছু দিনের মধ্যে সে অনেক টাকা পয়সার মালিক হয়ে গেলো। একদিন কথা প্রসঙ্গে তার স্ত্রীর কাছে পরীর কথা বলে ফেলে। পরের দিন ভরে মাছ ধরতে গিয়ে জেলে নৌকাসহ ডুবে গেলো আর ভেসে উঠলো না।

অনেকের ধারণা, পরীর এই দালানটি এখনো নাকি অক্ষত অবস্থায় পানির নিচে মাটির মধ্যে পুতে রয়েছে। প্রতি বছরে বর্ষাকালে মধুমতি নদীর কালীতলার বাকে প্রচন্ড ভারে পানিতে ঘুর্নিপাক হয়। আর এই ঘুর্নি পাকের মধ্যে পড়ে অনেক নৌকা ডুবে যায়। লোক মুখে শোনা যায় একবার এক দরবেশ কালীতলা গিয়ে নৌকায় পার হবার সময় ভীষণ তুফানের কবলে পড়েন। তিনি পার হয়ে গেলেন অতিকষ্টে। আর স্থানীয় জনগণকে সতর্ক করে গেলেন। কালীতলা সোজা পার না হবার জন্য। অনেক কাল ধরে অজানা মাঝি ছাড়া কেউ কালীতলা সোজা নৌকা নিয়ে পার হতো না।

দরবেশ নদী পার হয়ে দক্ষিণ দিকে মধুমতির পার দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলেন। নদীর পানির কাছে এসে দাঁড়ালেন। পানিতে ফুঁক দিলেন। তারপর চলে গেলেন। দরবেশ যেখানে দাঁড়িয়ে পানিতে ফুঁক দিয়ে ছিলেন, সেখান থেকে প্রায় আধা মাইল পর্যন্ত নদীতে আর প্রচন্ড তুফান হতো না। মাঝি মাল্লা নৌকা নিয়ে কালীতলা সোজা পার না হয়ে তুফান না হওয়া জায়গা দিয়ে পার হতো। কালীতলার সামান্য দূরে শিরগ্রামের বাঁকে আজও খুব বেশি তুফান হয় না।

মধুমতির রূপ অনেক পালটে গেছে। গ্রীষ্মকালে মধুমতির বিশাল এলাকা নিয়ে চর জেগে উঠেছে। অনেক জায়গা দিয়ে সামান্য পানি থাকে। যার ফলে কোন কোন জায়গা দিয়ে হেঁটে পার হওয়া যায়। ফলে কালীতলার কাছে নদীর পানির ঘুর্ণিপাকের ভয়াবহতা অনেক কমে গেছে। গ্রীষ্মকালে এ ঘুর্ণিপাক তেমন একটা দেখা যায় না। তবে বর্ষাকালে এ ঘূর্ণিপাক দেখা গেলেও তেমন ভয়াবহ বলে মনে হয় না। আজও মানুষ বর্ষাকালে কালীতলা সোজা নৌকায় পার হতে ভয় পায়।


গ্রামের নাম নরসিংহাটীঃ
মাগুরার একটি গ্রামের নাম নরসিংহাটি। মাগুরা জেলা শহর থেকে ৩ মাইল দক্ষিণে মীরের দুয়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামটি। ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা নয়নাভিরাম একটি পুরানো আমলের গ্রাম। কোন কিছু সৃষ্টির মূলে থাকে বিশেষ উৎস। তেমনি নরসিংহাটি গ্রামের সৃষ্টির উৎসে রয়েছে কিংবদন্তীর সুর যা আজও মানুষের মুখে মুখে ছুটে চলেছে। ঐতিহাসিকদের মতে ১৬০০ সালের আগে নরসিংহাটিতে কোন লোক বসতি ছিল না। পাশ দিয়ে প্রবাহিত ছিল নদী। আস্তে আস্তে নদীতে চর পড়ে নদীর প্রবাহ অনেক দূরে চলে যায়। তার ফলে চরের পার্শ্বে বড় বড় বিল বাওড়ের সৃষ্টি হয়। কালে কালে চরগুলোতে নানা গাছ-গাছড়া জন্মে মাটি শক্ত হয়। একসময় নরসিংহাটি গ্রাম এলাকা গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল।

১৬১২ সালে রাজ মহল হতে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। এ সময়ে নরসিংহাটি এলাকার নদী দিয়ে অনেক সময় দিল্লীতে মুর্শিদাবাদ থেকে রাজ কর্মচারী নৌকাযোগে রাজধানী ঢাকায় যাতায়াত করতেন। তারা যাতায়তের সময় এ সব উর্বর চরগুলো দেখতে পেয়ে লোক বসতি স্থাপন করার জন্য রাজ-দরবারে প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এবং লোকবসতি শুরু হয়।

মাগুরা জেলায় মহম্মদপুরে এককালে হযরত মহম্মদআলী শাহ (রঃ) ইসলাম প্রচারের জন্য আগমন করেছিলেন। তার সাথে শিষ্য হিসেবে এসেছিলেন হযরত কেদার শাহ (রঃ)। তিনি ইসলাম প্রচার করতে এসে ডাকাতদের হাতে আক্রান্ত হন পরে নরসিংহাটির গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যান। তখন নাকি সেই জঙ্গলে সিংহ ছিল। তিনি জঙ্গলের মধ্যে সিংহের কবলে পড়েন। সিংহ তাকে আক্রমণ করে মারাত্মকভাবে আহত করল। তিনি আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন। আল্লাহর অশেষ মহিমায় জঙ্গলের সব সিংহ তার কাছে ছুটে আসল এবং তার পদতলে লুটিয়ে পড়ল। তিনি তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলেন। পরে সিংহগুলো তার খুব বাধ্য হয়ে গেল। জঙ্গলের প্রচুর রসালো ফলের গাছ ছিল। তাই খেয়ে কেদার শাহ বেঁচে রইল। তিনি অধিকাংশ সময় আলস্নাহর ধ্যানে মগ্ন থাকেন। একদিন একদল ডাকাত কর্তৃক কেদার শাহ জঙ্গলের মধ্যে আক্রানত্ম হলেন। তারা খবর পেয়েছিল যে কেদার শাহের কাছে প্রচুর ধনন্ত আছে। কেদার শাহকে ডাকাতরা আক্রমণ করেছে দেখতে পেয়ে সিংহের পাল ছুটে এসে তাদের উপর ঝাড়িয়ে পড়ল। তখন এক যুবক ডাকাত তার হাতে ধনুক দিয়ে তীর মেরে একটি সিংহকে হত্যা করে ফেলে। এই দৃশ্য দেখে কেদার শাহ খুব দুঃখ পেলেন। তিনি আল্লাহর দরবারে আবার হাত উঠালেন। কিছু ক্ষণের মধ্যে যুবক ডাকাতটির মাথা হাত ও পা সিংহের আকৃতি হয়ে গেল। বাকি অংশ মানুষের মতই রয়ে গেল। পরে যুবকটি সিংহের দলে মিশে যায়। ডাকাত দল এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে জঙ্গল থেকে পালিয়ে যায়। কিছুদিন পর কেদার শাহ ইসলাম প্রচারের জন্য অন্যত্র চলে যান। তারপর সিংহের পাল জঙ্গল ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু মানুষ রূপী সিংহটি ঐ জঙ্গলে থেকে যায়। এ ঘটনার কিছু কাল পরে লোকজন বন জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন শুরু করে। একদিন একদল লোক জঙ্গল কাটতে এসে মানুষরূপী সিংহ দেখতে পায়। এই খবর চারি দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন দলে দলে লোক ছুটে এসে জঙ্গলটি ঘিরে ফেলে। তারপর মানুষরূপি সিংহটা লোকজন হত্যা না করে আহত অবস্থায় খাঁচার মধ্যে কৌশলে আবদ্ধ করে। মানুষরূপী সিংহকে খাঁচায় বন্দি করে নিয়ে আশা হলো লোকালয়ে। খবর হয়ে গেল চারি দিকে। মানুষরূপি সিংহ ধরা পড়েছে। নরসিংহ দেখার জন্য দলে দলে লোক ছুটে আসতে লাগল। কিন্তু মানুষরূপী সিংহটি মানুষের মাঝে এসে চুপচাপ খাঁচার মধ্যে পড়েছিল। আর নিরবে অশ্রু বিসর্জন করছিল। কয়েকদিন পরে খাঁচার মধ্যে মানুষরূপী সিংহটি মারা যায়। মরা সিংহটি কয়েকদিন যাবত রাখা হয়েছিল। কিন্তু যখন সিংহের লাশ থেকে গন্ধ বের হতে লাগল। তখন লোকে নদীর কিনারে পানির কাছে ফেলে রাখে। সিংহের লাশ নদীর পানির ছোয়া লাগার সাথে সাথে এক মরা যুবকের লাশে পরিণত হয়। এ লাশটি নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয় বলে শোনা যায়। মানুষরূপী সিংহটি মারা যাবার পরও লোকে আজকের নরসিংহাটি এলাকার মানুষের কাছে আসত এই কাহিনী শোনার জন্য। তখন লোকে ঐ এলাকার নাম দেয় নরসিংহ। কিন্তু দিন দিন মানুষ আসার চাপ বাড়তেই থাকে। তার ফলেই দোকান পাট গড়ে ওঠে। পরে একটা হাটে পরিণত হয়। তখন লোকে এ হাটের নাম দেয় নরসিংহহাটি। পরে নরসিংহহাটি থেকে নরসিংহাটি হয়। পরে এ হাটের বিলুপ্তি ঘটে। লোক মুখে শোনা যায় যেখানে মানুষরূপী সিংহটি মারা যায় সেখান দিয়ে মানুষ গভীর রাতে যাতায়াত করার সময় কেউ কেউ নাকি সিংহটিকে এককালে দেখতে পেত। আবার চোখ অন্য দিকে ঘুরাতেই অদৃশ্য হয়ে যেত। এককালে এ সিংহের ভয়ে লোকে গভীর রাতে নরসিংহাটি দিয়ে চলতে ভয় পেত। আজও নরসিংহাটি গ্রামের অনেক বৃদ্ধ বিধাকে তাদের নাতি নাতিনকে রাতে নরসিংহ আসছে বলে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়। বর্তমানে নরসিংহাটি গ্রামের পাশে কাটাখালী নামে বিরাট হাট বসে প্রতি বুধবারে। এই হাট এলাকায় নাকি নরসিংহ মারা গিয়েছিল। নরসিংহ নিয়ে মানুষের গান রচনা করেছিল। তবে সে গান আজ আর কারও কন্ঠে শুনা যায় না। অনেক অনুসন্ধান করেও সে গানের কথা খুঁজে পায়নি। সম্ভবত কালের অকালে হারিয়ে গেছে নরসিংহকে নিয়ে লোক কবির রচিত গান।


শ্রীপুরের বিরাট রাজাঃ
অনেকদিন আগের কথা। মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার রাজাপুরে বিরাট রাজার রাজধানী ছিল। তার রাজ্য সীমা উত্তরবঙ্গের পার্বতীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সেখানে আজও তার একটি দূর্গের ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান। এই দূর্গের সেনাপতি ছিলেন খুব শক্তিশালী।

বিরাট রাজা পাল বংশের লোক ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি প্রথমে বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী থাকলেও পরবর্তী সময়ে হিন্দু ধর্মের আচার অনুষ্ঠান পালন করতেন। রাজার রাজধানীর চিহ্ন রাজাপুরে না থাকলেও ধনাগার, নাট্যশালা ও কয়েদখানার ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান রয়েছে। রাজার অনেক হস্তী সৈন্য ছিল। যেখানে হস্তী সৈন্য থাকতো সেখানকার নাম হয়েছিল পিলখানা। বিরাট রাজার স্ত্রীর নাম ছিল শ্রী। শ্রী’র নাম অনুসারে শ্রীপুর হয়েছে। শ্রী তাম্বুল ভক্ত ছিলেন। তার অনেক গাভী ছিল। রানী তাম্বুলের ক্ষেত করে ছিলেন। তাতে প্রচুর তাম্বুল উৎপাদন হত। এই ক্ষেত যারা দেখা-শোনা করতো তাদেরকে বারুই বলা হতো। বারুইপাড়া নামে আজও গ্রাম আছে। আর যেখানে গাভী পালন করা হতো সেখানকার নাম হয়েছিল গোয়ালপাড়া।

এক সময় জনৈক মুসলিম শাসনকর্তা কর্তৃক বিরাট রাজার রাজ্য আক্রান্ত হয়। তার ফলে প্রচন্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলিম শাসনকর্তারা রাজধানী অবরোধ করে ফেলেন। যার ফলে রাজধানীর মধ্যে পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। তবু রাজা কোন রূপ পরাজয় মেনে না নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। রাজধানীর মধ্যে ছিল একটি অলৌকিক কূপ। রাজা তার আহত সৈন্যদের এই কূপের পানি পান করিয়ে সুস্থ্য করে তুলতে লাগলেন। এ কথা মুসলমান শাসনকর্তা গোপনে জানতে পারলেন। তখন তিনি কি করবেন ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছিলেন না। অপর দিকে সমান তালে যুদ্ধ চলছে। কিন্তু হার জিত কিছুই হচ্ছে না। কয়েকদিন ধরে যুদ্ধ চললো। উভয় পক্ষের অসংখ্য সৈন্য নিহত হলো। মুসলমান শাসনকর্তা পরিশেষে তার জনৈক অনুচরকে সাধুর বেশে বিরাট রাজার রাজধানীতে প্রেরণ করলেন। আর তার সাথে দিলেন গো মাংস। এই মাংস কূপে নিক্ষেপ করলে অলৌকিক শক্তি কমে যাবে। তার ফলে বিরাট রাজা তার আহত সৈন্যদের আর সুস্থ্য করে তুলতে পারবেন না। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই হবে রাজধানীর পতন।

গভীর রাত। কোথাও কোন সাড়া শব্দ নেই। দু’পক্ষের সৈন্যদের গোলাগুলি এখন বনদ্ধ রয়েছে। দীর্ঘ একটানা কয়েকদিন যাবত যুদ্ধ করার পর দু’পক্ষের সৈন্যরা খুবই ক্লানত্ম। অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কয়েক টুকরো গো-মাংস নিয়ে অনুচর রাজধানীতে প্রবেশ করলো অতিগোপনে। সাধুর বেশে  অনুচরকে দেখে বিরাট রাজার লোকজন কোন রূপ সন্দেহ করতে পারলো না। গভীর রাতে হঠাৎ সাধুর আগমন জেনে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলো। রাজার কানেও এ খবর পৌঁছে গেলো। তিনি সাধুকে তার দরবারে ডেকে নিলেন ও তার পদযুগলে প্রনাম দিলেন। আর বললেন, ‘সাধুবাবা আমি কেমন করে যুদ্ধে জয়ী হবো তার সঠিক কথাটি বলে দাও”।

সাধু কোন কথাই বললেন না। চোখ বুজে চুপচাপ বসে রইলো তখন ভোর হয়ে গেছে। সাধু বাবা এবার রাজার কাছে মুখ খুললো আর বললো,  আমাকে কূপের কাছে নিয়ে চলো।’ সাধুবাবাকে কুপের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো তারপর সবাইকে বললো, সরে যাও। সবাই দুরে চলে গেলো সাধুবাবা এবার গোপনে কূপের মধ্যে গো মাংস নিক্ষেপ করলো। চুপিসারে চলে আসতে গিয়ে সাধুবাবা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ‘মাজুদা মাজুদা’ বলে চিৎকার করতে লাগলো। ‘মাজুদা’ একটি উলস্নাস সূচক ধ্বনি বলে শোনা যায়। তারপর সাধু দৌড়ে রাজধানী থেকে পালিয়ে যায়।

আবার যুদ্ধ শুরু হলো। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বিরাট রাজার অধিকাংশ সৈন্য নিহত হলো। অনেকে মুসলমান শাসন কর্তার দলে যোগ দিলো। রাজা ও রাণী আত্মহত্যা করলেন। যেখানে সর্বশেষ যুদ্ধ হয় সেখানকার নাম হয়েছিল মাজুদিয়া রণক্ষেত্র। লোকেরা আজও সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রটিকে মাজুদিয়া বলে থাকে।

বিরাট রাজার রাজধানীর মধ্যে যে কূপ ছিল তার নাম ‘জীবন কূপ’। এই কূপটি ভরাট হয়ে গেছে। কূপটির উপরে দাঁড়িয়ে আছে একটি বড় বট গাছ। মহাকালের বোবা হয়ে বটগাছ কি যেন বলতে চায় তা কে জানে।


চিত্তবিশ্রাম ও পরাণপুরঃ
চিত্তবিশ্রাম ও পরাণপুর পাশাপাশি দুটি গ্রাম। গ্রাম দুটিতে তেমন কোন ঐতিহাসিক চিহ্ন না থাকলেও চমৎকার কাহিনী এখনো শোনা যায়। তবে ইতিহাস কোন দিনই কিংবদন্তী হতে পারে না। অপর দিকে কিংবদন্তীতে ইতিহাসের কংকাল খুঁজে পাওয়া যায়। সেই কংকালের শরীরে কল্পনার রক্তমাংশ জড়িয়ে কিংবদন্তী কখনো হেটে চলে আবার কখনো দ্রুত হেটে চলে। আবার কখনো দ্রুত দৌড়াতে থাকে। এরই প্রেক্ষাপটে চিত্তবিশ্রাম ও পরাণপরের কিংবদন্তী শোনাবো।

মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলা সদর থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে মহম্মদপুর বাবুখালি রোডের পাশে চিত্তবিশ্রাম ও পরাণপুর অবস্থিত। গ্রাম দুটি পাশ দিয়ে এককালে ছত্রাবতী বা ছাতিয়ান নদী প্রবাহিত ছিল। সেই নদী আজ না থাকলেও তার স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে ঝিলমিল মল। ছত্রাবতী নদী দিয়ে রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানী মহম্মদপুরে যাওয়া যায়। সীতরাম ১৬শ’ সালের শেষ ভাগে মহম্মদপুরে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। তার রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যামান।

সীতারাম খুব বিলাসপ্রিয় ছিলেন। এই বিলাসিতার কারণেই ৩ জন স্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন উপপত্নী ছিল। তিনি প্রথম বিয়ে করেন শ্রী কে। দ্বিতীয় বিয়ে হয় কমলার সাথে। তৃতীয় বিয়ে করলেও তার নাম জানা যায় না। তবে প্রথম স্ত্রী শ্রীর সাথে তার বেশিদিন বসবাস করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি শ্রীকে বেশি ভলোবাসতেন। সীতারাম যখন রাজা উপাধি পান তখন তার অভিষেক অনুষ্ঠানে তার মাতা বলেছিলেন সীতারামের অভিষেক অনুষ্ঠানে উচ্চ কুলীন বংশের মেয়ে বউ হয়ে যোগদান করবে। প্রথমে সীতারাম প্রতিবাদ জানলেও মায়ের কথা রক্ষার্থে উচ্চ কুলীন বংশীয় মেয়ে কমলাকে বিয়ে করেছিলেন।

শোনা যায় কমলার বিয়ের সময় কমলার ওজনের সমান টাকা তার পিতাকে সীতারাম প্রদান করেছিলেন। শ্রীর পিতার বংশ মর্যাদা একটু নিচু ছিল বলেই তাকে এই চরম শাসিত্ম ভোগ করতে হয়েছিল। কমলার সাথে সীতারামের যখন বিয়ে হয় তখন শ্রী কোন প্রতিবাদ করেনি। তবে সে রাজধানী থেকে বের হয়ে এসেছিলেন। রাজা সীতারাম তার জন্য চিত্তবিশ্রাম নামে একটি প্রমোদ ভবন নির্মাণ করেন। রাজধানী থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে ছত্রাবতী নদীর তীরে। চিত্তবিশ্রাম প্রমোদ ভবনের পাশে পরাণপুর নামে আরো একটি প্রমোদ ভবন নির্মাণ করেন। চিত্তবিশ্রাম নামের প্রমোদ ভবনে রাণী শ্রী থাকতেন। তার সেবার জন্য অনেক দাসী নিয়োগ করা হয়েছিল। প্রমোদভবন দু’টি খুবই কারুকার্যখচিত ছিল। রাজা সীতারাম প্রায়ই শ্রীর গৃহে আসতেন। চিত্তবিশ্রাম ও পরাণপুর প্রমোদ ভবনের নামানুসারে আজ দু’টি গ্রামের নাম হয়েছে।

শ্রীর মানসিক প্রশান্তির জন্য রাজা সীতারাম এত কিছু করলেও শ্রী শান্তিতে ছিলেন না। সতীনদের কথা ভেবে তিনি জ্বলে পুড়ে মরতেন। পরবর্তী সময়ে শ্রী মানুষের সাথে কথা বলা বন্ধ করেছিলেন। সব সময় চুপ চাপ বসে থাকতেন।

একদিন খবর আসলো সীতারাম যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন। রাজধানী মহম্মদপুর পোড়া বারুদের গন্ধে ভরা। যেখানে সেখানে মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সীতারাম পলায়ন করেছেন। রাজধানীতে লুটপাট চলছে। এ কথা শুনে রানী শ্রী, ছত্রাবতী নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেন। শোনা যায়, যুদ্ধে যাবার সময় সীতারাম শ্রীর কাছে এসেছিলেন। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যুদ্ধে হয়তো আমি হেরে যাব, তবু যুদ্ধ করতে হবে। যাবার সময় শ্রীর কয়েকটি পোষা কবুতর সাথে নিয়ে যান। আর সীতারাম বলেন, যখন দেখবে কবুতর ফিরে এসেছে তাহলে বুঝবে আমি যুদ্ধে পরাজিত হয়েছি। তখন তুমি নদীর জলে আত্মহত্যা করবে। কবুতর ফিরে আসে। শ্রী তখন তার প্রমোদ তরীতে দাসীও অন্যান্য লোকজন নিয়ে ছত্রাবতী নদীর মাঝখানে এসে অবস্থান করতে থাকেন। এক সময় প্রমোদ তরীর নীচে কোড়াল মেরে বড় ছিদ্র করে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রমোদ তরী ছত্রাবতীর গভীর জলে নিমজ্জিত হয়। শ্রী তার দাসীদের নিয়ে নিমজ্জিত হয়ে গেল। দীর্ঘদিন যাবত পরানপুর ও চিত্তবিশ্রাম প্রমোদ ভবন দাঁড়িয়ে ছিল। পরে ছত্রাবতী নদীর প্রবল ভাঙ্গণে তা নিশ্চিন্ন হয়ে যায়। তাছা ছত্রাবতী নদী দিয়ে প্রমোদ ভবন নির্মাণ করার জন্য যে ঘাটে পাথর ও ইট এনে রাখা হয়েছিল, সে ঘাটের নাম হয়েছিল পাথর ঘাটা। চিত্তবিশ্রাম ও পরাণপুরের পাশে পাথর ঘাটা নামে একটি গ্রাম আজও বিদ্যমান। ছত্রাবতী নদী যখন চালু ছিল তখন নাকি লোক গভীর রাতে নদীর মধ্যে কোন কোন সময় নৌকা ডুবি মানুষের মত চিৎকার শোনা যেত। লোকে বলত রাণী শ্রীর প্রমোদ তরী ডুবে যাবার সময়ে শ্রী ও দাসীদের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। সেই চিৎকারে গভীর রাতে কেঁপে উঠতো ছত্রাবতী  নদীর পানি, আর দুরে ডেকে উটতো নাম নাজানা পাখি। করুন কান্নার মত তার সুর।


তথ্য সংগ্রহে:
আবু বাসার আখন্দ
মাগুরা জেলা প্রতিনিধি, মাছরাঙ্গা টেলিভিশন
 
Advertisement
 
 
Today, there have been 3263 visitors (6326 hits) on this page!
=> Do you also want a homepage for free? Then click here! <=